সাম্প্রদায়িক চিঠি
"কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে";
লঘুর যাতনা গরিষ্ঠের সর্বদা উপলব্ধি হয় না
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের 'শেষলেখা' কাব্যগ্রন্থে কঠিন সত্যকেই একমাত্র অবলম্বন করে, তাকেই ভালোভাসতে চেয়েছিলেন। কারণ কঠিন সত্য কখনো বঞ্চনা করে না। যদি কঠিন সত্যকে, কঠিন বাস্তবতাকে আগের থেকেই ভালো করে জানতে এবং বুঝতে পারি ; তবে অনাকাঙ্ক্ষিত যে কোন কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিতে আর কষ্ট হয় না। আমাদের বুঝতে হবে জীবন কোন পুষ্পশয্যা নয়।
"রূপ-নারানের কূলে
জেগে উঠিলাম,
জানিলাম এ জগৎ
স্বপ্ন নয়।
রক্তের অক্ষরে দেখিলাম
আপনার রূপ,
চিনিলাম আপনারে
আঘাতে আঘাতে
বেদনায় বেদনায় ;
সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালবাসিলাম,
সে কখনো করে না বঞ্চনা।"
জীবন মানেই প্রতিনিয়ত কঠিন বাস্তবতার উপলব্ধি। জীবন মানে যেমন কঠিন বাস্তবতা ; তেমনি পৃথিবীর কয়েকটি ধর্মান্ধ রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু জীবন মানেই কঠিনতর রূঢ় বাস্তবতা। এ কারণেই দেখা যায়, সে দেশগুলো থেকে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বিলীয়মান হচ্ছে। বিষয়টি মানব সভ্যতার জন্যে অশনিসংকেত।বিপরীতে ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ সহ অধিকাংশ মানবিক দেশেই সংখ্যালঘু মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার সুসংবদ্ধ হচ্ছে।
বিদেশি আরব,তুর্কি,পাঠান, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে বহুবছরে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে এদেশের ভূমিপুত্র হিন্দুদের মনমন্দির আজ জরাজীর্ন এবং ভগ্নদশা। সেই ভগ্ন মন্দিরে যে বিশ্বাসের ফাটল ধরেছে, সেই ফাটলের আসু সংস্কার প্রয়োজন। আজ প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের 'মালাউন' শব্দটি প্রতিনিয়ত শুনতে হয়। ছোটবেলায় স্কুলের সেই বন্ধুদের থেকে যে মালাউন এবং কাফের শব্দটি শুনেছি, সমাজের পিছদুয়ারে একটু কান পাতলে আজও প্রতিনিয়ত শব্দগুলো শুনতে পাই। এ শব্দগুলো শুনতে শুনতে শব্দগুলোর প্রতি এক ধরণের সহজাত অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে যাচ্ছে সংখ্যালঘুদের। মন্ত্রী, এমপি, সরকারি বা বেসরকারি কর্মকর্তা, বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপাচার্য তিনি যাই হোক না কেন প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে শব্দগুলো তাদের শুনতেই হবে। এটাই যেন তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত ভবিতব্য। চট্টগ্রামে যখন স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলাম, তখন আরেকটি নতুন শব্দ শিখলাম, তা হল 'ড্যাডা'। ছোটকাল থেকেই একজন সংখ্যালঘু শিশুকে পারিবারিক ভাবে শিখানো হয়, ধর্ম নিয়ে যেন স্কুলে বা রাস্তাঘাটে আলোচনা না করা হয়। এ শিক্ষার মাধ্যমে পারিবারিকভাবেই শিশুমনে একটি ভীতির জন্ম হয়। যা দিনে দিনে সংখ্যালঘু মননে বাড়তেই থাকে। স্কুলে ছোট্ট শিশুটির বন্ধুরা যখন তার ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে বিভিন্ন আপত্তিকর বিভ্রান্তিকর কটুক্তি করে, সেই সকল নোংরামি তখন শিশুটি হজম করে যায়। কদাচিৎ পরিবারকে জানায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জানায় না। পরিণামে শিশুটি একটু একটু করে হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। তার আত্মবিশ্বাস কমে যেতে থাকে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মানসিক যাতনার সাথে সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। সেই চাপের পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকেই দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রকারের মিথ্যা গুলিস্তান মার্কেটিং করে ফুসলিয়ে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। রাজধানী শহর থেকে বিভিন্ন প্রান্তিক পর্যায়ে ওয়াজ মাহফিলে নারী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে নোংরামির চূড়ান্ত করা হচ্ছে। বিষয়টি জাতীয় সংসদে পর্যন্ত আলোচিত।প্রতিটি পদে পদে মানসিক ভাবে নির্যাতন করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের অন্তরের সুন্দর পবিত্র মন্দিরটিকে প্রতিনিয়ত তছনছ করে দেওয়া হচ্ছে । হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাস্য মন্দিরের জরাজীর্ন ভগ্নমন্দিরকে হয়ত পুনরায় সংস্কার সাধন করা সম্ভব। কিন্তু ভিতরের মনের ভগ্নমন্দিরটার সংস্কার কি আদৌ সম্ভব? এ জাজ্জ্বল্যমান প্রশ্নের উত্তর আমাদের কারো কাছেই নেই। পাকিস্থানের পরাজিত প্রেতাত্মা আজ পূর্বের থেকেও আরও শক্তিশালীভাবে সংগঠিত। তারা আছে সুযোগের অপেক্ষায় ক্ষমতার পালাবদলের অপেক্ষায়। তারা প্রতিক্ষায় প্রহর গুনছে, কখন সুযোগ পাবে এবং আবারও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সহ দেশের প্রগতিশীল চিন্তার মানুষের উপরে ঝাপিয়ে পরে তাদের উপরে বর্বরোচিত নৃশংসতা করবে।
সামান্য একটা চায়ের দোকানে গিয়ে, চা বিস্কুট খাওয়ার পরে দোকানদারের কাছে যদি বলা হয়, ভাই একগ্লাস জল দিন তো। তবে "এক গ্লাস জল"-এ বাক্যটি শুনে দোকানদার যে দৃষ্টিতে তাকায়, এই দৃষ্টির ভাষা যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ তিনি কোনদিনও বুঝতে পারবেন কিনা আমি ঠিক জানি না। বছরে একদিন দুইদিন ধর্মনিরপেক্ষ বা বাঙালিত্ব নিয়ে হয়ত রাস্তায় বা জনসভায় বক্তব্য দেয়া যায়। কিন্তু একজন সংখ্যালঘুর মনবেদনা এবং তাদের রূঢ় বাস্তবতা সম্যক উপলব্ধি করা যায় না। এ প্রসঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি ঘটনা মনে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী একটি খাবারের হোটেলে রাতে মাঝেমধ্যে খেতে যেতাম। হোটেলের একটি ছোটছেলে নিয়মিত খাবার পরিবেশন করতো। একদিন আমি যখন ওকে খাবার খেতে খেতে একগ্লাস জল নিয়ে আসতে বললাম। ছোট্ট ছেলেটি সরল মনে বল্লো, "ও মামা আপনি হিন্দু? তবে আপনাকে দেখতে হিন্দুর মত মনে হয় না, আপনি না অনেক ভাল"। আমি ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, হিন্দুরা যে খারাপ এটা তোমাকে কে শিখিয়েছে? ছেলেটি মাথা নিচু করে একটু মুচকি হাসি দিয়ে দূরে চলে গেল। মনে হল সে বিষয়টি লজ্জিত।তবে ছেলেটি হয়ত কোন নেতিবাচক মনোভাব থেকে কথাগুলো বলেনি। তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাপেক্ষে সরল মনেই কথাগুলো বলেছে। কিন্তু ছাত্রাবস্থার সেই ঘটনাটি এখনো আমার মনে পড়ে। কারণ এর মধ্যে এক নির্মম সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে। যা একজন সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তি সচরাচর অনুভব করতে পারবে না। যদি সেই ব্যক্তি অত্যন্ত মানবিক বোধসম্পন্ন না হয়। সংখ্যালঘুদের বেদনা উপলব্ধি করতে হলে, নিজেকে একজন সংখ্যালঘুর ভাবনা এবং মানসিকতা নিয়ে অনুভব করতে হবে। তা না হলে সে, লোকদেখানো সম্প্রীতির তত্ত্বকথা শুধুই তোতাপাখির মত মুখস্থ আউড়ে যাবে। এই তত্ত্ব তার ব্যক্তিজীবন এবং পরিবার জীবনে প্রতিফলিত হবে না। বাস্তবতা সর্বদা অধরাই থেকে যাবে। এ বিষয়টি কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার অত্যন্ত সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতায়।
"চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন
ব্যথিতবেদন বুঝিতে পারে।
কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে
কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে।
যতদিন ভবে, না হবে না হবে,
তোমার অবস্থা আমার সম।
ঈষৎ হাসিবে, শুনে না শুনিবে
বুঝে না বুঝিবে, যাতনা মম।"
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সংখ্যালঘুর ব্যাথা উপলব্ধি করতে পারলে দেশের সংখ্যালঘুদের মনবল বৃদ্ধি পায়। তারা ভাবে, আমরা একা নই। সংখ্যাগরিষ্ঠের করুণা ভিক্ষার আগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধনী গরিব নির্বিশেষে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের নিজেদের মধ্যে আন্তঃসম্প্রীতি প্রয়োজন। নিজেদের মধ্যে মত-পথ নির্বিশেষে এ আন্তঃসম্প্রীতি থাকলে; তবে বিভিন্ন প্রয়োজনে সংখ্যাগরিষ্ঠের করুণা ভিক্ষার প্রতাশ্যায় আর বসে থাকতে হয় না। নিজেদের সমস্যা নিজেরাই কিছুটা হলেও সমাধান করতে পারে।
বর্তমানে আমরা সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সভা সেমিনার অনুষ্ঠান মঞ্চে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধর্মনিরপেক্ষতার জ্ঞানগর্ভ পাঠ দিতে দেখি বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে।এ বক্তব্যগুলো যারা প্রদান করেন বিভিন্ন অনুষ্ঠান মঞ্চে, সেই সম্প্রীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ প্রদানকারী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনে সেই পাঠের নূন্যতম চর্চা নেই। সামান্যতম ব্যবহারও নেই। ব্যতিক্রমী দুইএকজন ছাড়া এই সকল ব্যক্তিদের অধিকাংশ বক্তব্য শুধুই লোকদেখানো "সং ভং চং"!

Post a Comment